উত্তরপূর্ব ডেস্ক
সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত নাগরিক কমিটির প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের পক্ষে এবার গণসংযোগে নামলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্ঠামন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমদ। গতকাল শুক্রবার বিকালে নগরীর কাজীটুলা এলাকায় পথসভার মাধ্যমে তারা গণসংযোগ শুরু করেন।
সিলেট নগরবাসীর মন জয় করতে প্রার্থীরা যেমন প্রতিশ্র“তির ফুলঝুরি ছড়াচ্ছেন তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঘায়েল করতে তারা ছুড়ছেন একের পর এক ‘কথার বাণ’। মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে এ ধরণের বাকযুদ্ধ চললেও সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন দুই মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও আরিফুল হক চৌধুরী। প্রতিদিনই তারা পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে আক্রমণাত্মক বিভিন্ন মন্তব্য করছেন। তাদের এসব মন্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও চলছে সাধারণ মানুষের মাঝে। বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া তরুণদের হৃদয়ে কাটছে তীক্ষè দাগ।
সিলেট সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক আগ থেকেই মেয়র ও কাউন্সিলর পদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তুলার প্রচেষ্টা চালান। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নিজেদের প্রার্থীতা ঘোষণা করে তারা আরো তৎপর হয়ে ওঠেন। জনরায় নিজেদের পক্ষে নিতে তারা যাচ্ছেন নগরবাসীর দ্বারে দ্বারে। বিভিন্ন প্রতিশ্র“তির মাধ্যমে শোনাচ্ছেন আশার বাণীও। আর ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা যেমন ‘প্রতিশ্র“তি’ ও ‘অঙ্গিকার’র করে যাচ্ছেন তেমনি তারা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন আক্রমণাত্মক মন্তব্যও করছেন। তবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঘায়েল করতে প্রায় সব মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে পরোক্ষভাবে এ ধরণের বাকযুদ্ধ চললেও সবার ছেয়ে এগিয়ে রয়েছেন দুই মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও আরিফুল হক চৌধুরী। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল সমর্থিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী কামরান নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সিলেটকে ‘আধ্যাত্মিক, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ও পর্যটন নগরী’ হিসেবে গড়ে তুলার আঙ্গিকারের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে ভোট চাচ্ছেন। পাশাপাশি নগরীর উন্নয়নে তার নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্যও নগরবাসীর সামনে তুলে ধরে সিলেটকে শান্তির জনপদ হিসেবে রূপ দিতে আগামী নির্বাচনেও তার পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রতি আহবান জানান। অপরদিকে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীও ভোটারদের মন জয়ে কারে যাচ্ছেন একের পর এক অঙ্গিকার। ‘পরিচ্ছন্ন আধুনিক সিলেট নগরী করা’, ‘নগরবাসীর সেবক হওয়া’, ‘যানজট দূর করা’ ‘ডিজিটাল নগরী উপহার দেওয়া’সহ নানা প্রতিশ্র“তি ও অঙ্গিকারের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে টানার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।
সাধারণ মানুষের মন জয় করতে প্রার্থীরা যেমন ‘প্রতিশ্র“তি’র ফুলঝুরি ছড়াচ্ছেন তেমনি প্রচারণাকালে তাদের মুখ থেকে বের হচ্ছে ‘অগ্নিস্ফুলিঙ্গ’ স্বরূপ বিভিন্ন মন্তব্য। তবে এসব ‘কথার বাণ’র লক্ষ্যবস্তু কিন্তু নগরীর সাধারণ মানুষ নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা নির্বাচনী প্রচারণায় নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে নিজেদের অবদান-সম্পৃক্ততার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অতীত নেতিবাচক কর্মকান্ডও তুলে ধরছেন ভোটারদের সামনে। পরপস্পরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-লুঠপাট, সন্ত্রাসী, অপশাসন, দায়িত্বহীনতা, দলীয়করণ, উন্নয়নকাজ ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে প্রতিদিনই আক্রমণাত্মক মন্তব্য করছেন দুই মেয়র প্রার্থী কামরান ও আরিফ। ভোটের লড়াইয়ে টেক্কা দিতে এসব বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর ছোড়া ‘কথার বাণ’র উত্তরও তারা দিয়ে যাচ্ছেন সময় ক্ষেপন না করে। ফলে অনেক সময় তারা সংযমও ধরে রাখতে পারছেন না। প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও করে বসছেন অযাচিত মন্তব্য।
এদিকে, দুই মেয়র প্রার্থীর আক্রমণাত্মক এসব মন্তব্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া তরুণ প্রজন্মের মনে এগুলো কাটছে তীক্ষè দাগ। অনেকে এসব মন্তব্যকে নির্বাচনী লড়াইয়ের একটি অংশ হিসেবে মেনে নিলেও তরুণ প্রজন্মের কাছে তা প্রশ্নবিদ্ধই থাকছে। তারা মনে করে ভোটের লড়াইয়ে কথার লড়াইও থাকতে পারে তবে তার ভাষা সংযমি হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন মন্তব্য করা স্বাভাবিক। তবে তা সুন্দর ও গোছালো ভাষায় হওয়াটা কাম্য। সিলেট এমসি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম বলেন, সিলেট সিটি নির্বাচনে অতীতের দুটি টার্মের চেয়ে এবার দুই মেয়র প্রার্থীর মধ্যে কঠিন লড়াই হবে বলে মনে হচ্ছে। তবে কয়েকদিন ধরে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যে ধরণের আক্রমণাত্মক মন্তব্য শুরু করেছেন তাতে মনে হচ্ছে প্রার্থীদের কাছে বিনয়ের চেয়ে রুক্ষ কথা বলাই মুখ্য হয়ে দাড়িয়েছে। মদন মোহন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র স্বপন দাশ বলেন, যেহেতু এবার মেয়র পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাই মূল দুই প্রার্থী অনেক সময় বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে এসব তরুণদের অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে গত শুক্রবার সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া ২৪ কিংবা ২৫ বছরের যুবকের একটি মন্তব্য। সিটি নির্বাচন এবং দুই মেয়র প্রার্থীর প্রচরণার বিষয় নিয়ে আলাপের এক পর্যায়ে এলোকেশি যুবকটি দু’হাত প্রসারিত করে বলে ওঠে প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সেই ‘আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য, মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য’ ছন্দটি Ñযার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে নগরবাসীর মনজয়ে দুই মেয়র প্রার্থীর মিষ্টি কথার প্রচারণা ও তাদের ‘বাকযুদ্ধ’র বিষয়টি।
উত্তরপূর্ব প্রতিবেদন
সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সরাসরি স¤প্রচারিত অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নকর্তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বিএনপির মেয়রপ্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। অতীত কর্মকা-ের জন্য প্রশ্নকর্তা আরিফুল হক চৌধুরীকে সন্ত্রাসীদের গডফাদার আখ্যায়িত করে মেয়র হলে কিভাবে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করবেন- এমন প্রশ্ন করায় আরিফুল হক চৌধুরী প্রশ্নকারীর দিকে তেড়ে যান। ফলে অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন এসএটিভি কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এসএটিভি শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ছালাহ উদ্দিন রিমনকে নিয়ে লাইভ শো’র আয়োজন করে। জালালাবাদ গ্যাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত লাইভ শো’র শেষ পর্যায়ে উপস্থিত এক দর্শক বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আরিফুল হক চৌধুরী সন্ত্রাসীদের গডফাদার ছিলেন- উল্লেখ করে আরিফের কাছে জানতে চান নির্বাচিত হলে তিনি কিভাবে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করবেন। ওই প্রশ্নের পরই আরিফুল হক চৌধুরী উত্তেজিত হয়ে পড়েন। উত্তেজিত আরিফুল বলতে থাকেন, “আমাকে গডফাদার যে বলেছে তাকে চিনে রাখ, দুইঘণ্টার মধ্যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” মেয়র প্রার্থী আরিফের এমন আচরণে হতভম্ব হয়ে পড়েন উপস্থিত দর্শকরা। এ নিয়ে জালালাবাদ গ্যাস অডিটোরিয়ামে কামরান ও আরিফ সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে টিভি কর্তৃপক্ষ তাদের লাইভ শো’র সমাপ্তি টানেন। পরে কামরান সমর্থকরা ‘আনারস, আনারস’ স্লোগান দিতে দিতে অডিটোরিয়াম এলাকা ত্যাগ করেন।
সরাসরি অনুষ্ঠান দেখে কলেজ ছাত্র রাকিব বলেন, মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগেই এরকম আচরণ করলে মেয়র নির্বাচিত হলে আরিফুল হক কি করবেন তা স্পষ্ট হয়ে গেলো এই আচরণে।
এ ব্যাপারে সিলেটের রিটার্নিং অফিসার এন এম এজহারুল হক উত্তরপূর্বকে বলেন, ‘এখনো আমার কাছে এ রকম কোনো অভিযোগ আসেনি।’ একপর্যায়ে ‘এটা আমার দেখার বিষয় নয় বলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।’